পার্সোনাল ফাইনান্স বা ব্যাক্তিগত অর্থায়ন কী? । What is personal finance?

মানুষের চাহিদা অসীম, কিন্তু অসীম চাহিদার তুলনায় আয় সীমিত। সীমিত আয়ে আমাদের অসীম অভাব পূরণের চেষ্টা করতে হয়, কিন্তু টাকা পয়সা সঠিক ভাবে খরচ করতে না পারায় অনেককেই হয়তো ঋণের বোঝা বয়ে বেড়াতে হয় কিংবা আর্থিক সমস্যায় পড়তে হয়। তবে যদি একটু হিসাব করে চলা যায় তাহলেই এই সীমিত আয় দিয়ে সুন্দর ভাবে জীবন যাপন করা যায়। এর জন্য আমাদের পারসোনাল ফাইনান্স বা ব্যাক্তিগত অর্থায়ন জানা বিশেষ প্রয়োজন। ভবিষ্যতে আর্থিক সমস্যা বা ঝুঁকি এড়াতে পারসোনাল ফাইনান্স আমাদের বিশেষ ভাবে সাহায্য করতে পারে। 

ব্যক্তিগত অর্থায়ন কী? ( What is personal finance )

ব্যক্তিগত অর্থায়ন হচ্ছে ব্যাক্তি বা পরিবারের আর্থিক কর্মকান্ড সংক্রান্ত সকল বিষয়ের পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনা। অর্থাৎ আপনার আয়, ব্যয়, বিনিয়োগ, সঞ্চয়, রিটায়ারমেন্ট ভবিষ্যত যেকোনো আর্থিক বিপর্যয় থেকে সুরক্ষা ইত্যাদি।

ব্যক্তিগত অর্থায়ন কেন গুরুত্বপূর্ণ? ( Why personal finance is important )

মানুষের জীবনে কখন বিপদ আসে তা বলা যায় না, বিপদ যে কোন সময় আসতে পারে। তাই আগে থেকেই ভবিষ্যত আর্থিক সমস্যার পরিকল্পনা করা থাকলে ভবিষ্যতে সমস্যা কম হবে। করোনা পেনডামিকের কারণে অনেকেই তাদের চাকরি হারিয়ে নিঃস্ব হয়েছে, কিন্তু যদি তারা আর্থিক বিষয়ের ভবিষ্যত পরিকল্পনা করে রাখতো তাহলে হয়তো চাকরি হারালেও কঠিন ভাবে আর্থিক বিপর্যয়ের সম্মুখীন হতো না। ব্যক্তিগত অর্থায়ন কেন গুরুত্বপূর্ণ তার সাতটি পয়েন্ট এখানে উল্লেখ করে দিচ্ছি

  1. আপনার ব্যয়ের খাতগুলো নির্ধারণ করা ।
  2. নিজের আয় বৃদ্ধির উপায় খুঁজে বের করা।
  3. নিজের জন্য ইমার্জেন্সি ফান্ড তৈরি করা।
  4. ব্যাক্তিগত ঋণ ব্যবস্থাপনা করা।
  5. সঞ্চয় বৃদ্ধির উপায় জানা।
  6. অবসর পরিকল্পনা।
  7. বিনিয়োগের খাত নির্ধারণ।


পার্সোনাল ফাইনান্সের লক্ষ্য ( Goal of personal finance )

এক কথায় বলতে গেলে ব্যাক্তিগত অর্থায়নের লক্ষ্য হচ্ছে আর্থিক স্থিতিশীলতা অর্জন। যাতে করে ভবিষ্যতে কোন আর্থিক সমস্যায় না পড়তে হয়। ০৪ নভেম্বর ২০২১ এ প্রথম আলোর একটি জরিপে দেখা গেছে করোনাকালে নতুন করে দরিদ্র হয়েছে ৩ কোটি ২৪ লাখ মানুষ। এসব মানুষ যদি ভবিষ্যতের কথা ভেবে ব্যাক্তিগত অর্থায়নের নীতি মেনে খরচ করতো তাহলে হয়তো এতো মানুষ দরিদ্র হতো না।

বাজেট নির্ধারণ ( Budgeting )

আপনি যদি আপনার দৈনন্দিন জীবনের খরচগুলোর জন্য নির্দিষ্ট বাজেট নির্ধারণ করেন তাহলে অতিরিক্ত খরচের হাত থেকে বেঁচে যাবেন। কারণ তখন যা কিছু করবেন তা বাজেটের মধ্য থেকেই করতে হবে।

কিছু বাজেটিং কৌশল ( Some budgeting techniques )

  • ৫০/৩০/২০ বাজেটিং পদ্ধতি
  • পে ইউর সেল্ফ ফাস্ট
  • ইনভেলাপ পদ্ধতি
  • শূণ্য ভিত্তিক পদ্ধতি
  • বাজেটিং অ্যাপস

৫০/৩০/২০ বাজেটিং

এ পদ্ধতিতে বলা হয়েছে আপনার আয়ের ৫০ পার্সেন্ট ব্যয় করুন প্রয়োজনীয় খরচগুলোতে, যেমন বাসা ভাড়া, বাজার খরচ, ইউটিলিটি বিল, ছেলে মেয়েদের পড়াশোনার খরচ ইত্যাদি। ৩০ পার্সেন্ট দিয়ে আপনার শখের কাজগুলোতে ব্যয় করুন। বাকি ২০ পার্সেন্ট সঞ্চয় করুন। এভাবে ২০ পার্সেন্ট সঞ্চয় করার ফলে বছর শেষে দেখবেন আপনি অনেক টাকা সঞ্চয় করে ফেলেছেন। তবে এ পদ্ধতির কিছু সমস্যা ও রয়েছে, যেমন :

  1. স্বল্প আয়ের মানুষের পক্ষে ৩০ পার্সেন্ট শখের পেছনে ব্যয় করা বিলাসিতা।
  2. বেশি আয়ের মানুষের জন্য এই পদ্ধতি মনে হয় বেশি খরচ করতে উৎসাহিত করে।
  3. পরিস্থিতি সাপেক্ষে সঞ্চয়ের পরিমাণ ২০ পার্সেন্ট এর বেশি করা লাগতে পারে।

এক্ষেত্রে পরামর্শ হলো

  1. চেষ্টা করবেন যেন গুরুত্বপূর্ণ ব্যয় গুলো ৫০ পার্সেন্টের বেশি খরচ না হয়।
  2. শখের পেছনে ৩০ পার্সেন্টের কম ব্যয় করতে চেষ্টা করবেন।
  3. সম্ভব হলে ২০ পার্সেন্টের বেশি টাকা সঞ্চয় করুন।


পে ইউর সেল্ফ ফাস্ট

এই পদ্ধতিতে বলা হয়েছে, প্রথমেই আপনার প্রয়োজনীয় খরচের টাকা গুলো আলাদা করুন। প্রয়োজনীয় খরচ বলতে বাসা ভাড়া, গ্রোসারি, ইউটিলিটি বিল, ছেলে মেয়েদের স্কুলের খরচ ইত্যাদি। এরপর বাকি টাকা দিয়ে অনান্য খরচ করুন। তবে এই পদ্ধতিতে সমস্যা হলো এখানে সঞ্চয়কে উৎসাহিত করে না। তবে প্রয়োজনীয় খরচের খাতে সঞ্চয়ের হিসাবটাও রাখতে পারেন। এজন্য কোন ব্যাংকে ডিপিএস করে রাখতে পারেন।

ইনভেলাপ বাজেটিং

এ পদ্ধতিতে বলা হয়, আপনার প্রয়োজনীয় খরচের টাকা গুলো আলাদা আলাদা খামে ভরে রাখুন। তবে এ পদ্ধতিতে সমস্যা হলো আপনাকে বেশি ক্যাশ টাকা বহন করতে হবে। এক্ষেত্রে পরামর্শ হলো কিছু টাকা ব্যাংক অ্যাকাউন্টে জমা রাখুন। এবং কিছু ক্ষেত্রে অনলাইন ট্রানজেকশন ব্যবহার করুন।

শূণ্য ভিত্তিক পদ্ধতি

এ পদ্ধতিতে বলা হয়েছে, আপনার টাকা আপনি কিভাবে ব্যয় করবেন তার একটা পরিকল্পনা করুন, এবং সেই অনুযায়ী খরচ করুন।

বাজেটিং অ্যাপস

আপনি চাইলে মাইক্রোসফট এক্সেল কিংবা বিভিন্ন ধরনের বাজেটিং অ্যাপস ব্যবহার করতে পারবেন। গুগল প্লে স্টোরে কিংবা অ্যাপ স্টোরে বিভিন্ন রকম বাজেটিং অ্যাপস পাওয়া যায়। যেগুলোতে বাজেটিং হিসাব, পরিকল্পনা ও সাজেশন পাওয়া যায়।

আপনার ব্যয় কমিয়ে আনুন ( Reduce your expense )

ব্যয় কমানো নির্ভর করে আপনার সংযমের উপর, যেটা সবচেয়ে কঠিন। এই কঠিন কাজটি করতে পারলে আমাদের ব্যয় অনেকটাই কমিয়ে আনা সম্ভব। সর্বোপরি আমাদের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রই আমাদের মিতব্যয়ী হ‌ওয়া উচিত। হিসাব করে চলতে পারলে আমাদের আর্থিক ভোগান্তি কম হবে। এক্ষেত্রে ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলতে পারলে ভালো হয়। কারণ ধর্মে অপচয় করা নিষেধ করা হয়েছে এবং মিতব্যয়ী হতে উৎসাহিত করেছে।

আপনার ঝুঁকি সমূহ চিহ্নিত করুন ( Identify your risks )

আমাদের জীবনে যে কোন ভবিষ্যত পরিকল্পনার ক্ষেত্রে অন্যতম প্রধান কাজ হচ্ছে রিস্ক বা ঝুঁকিগুলো নির্ধারণ করা। ব্যাক্তিগত আর্থিক পরিকল্পনার ক্ষেত্রেও তাই আপনাকে ঝুঁকিগুলো নির্ধারণ করতে হবে। ব্যাক্তি জীবনে কী কী আর্থিক ঝুঁকিগুলোর সম্মুখীন হতে পারি তা উল্লেখ করা হলো :

আয় ঝুঁকি

মৃত্যু : মানুষের মৃত্যু কখন হবে তা কেউ বলতে পারে না, আপনার পরিবারের প্রধান উপার্জনকারী ব্যাক্তির হঠাৎ করেই মৃত্যু হতে পারে। পরিবারের উপার্জনকারী ব্যক্তিটির মৃত্যু হলে কি প্রভাব ফেলতে পারে তা আগে থেকেই অনুধাবন করা উচিত। এরপর কী করে আর্থিক সমস্যা মিটানো যায় তা পরিকল্পনা করে রাখা উচিত।

আরো পড়ুন : CPA Marketing কি এবং কিভাবে করবেন?

অক্ষম : পরিবারের উপার্জনকারী ব্যাক্তির সাথে দূর্ভাগ্যবশত যদি কোন দূর্ঘটনা ঘটে যায়, এবং এর ফলে তিনি যদি আর আয় করতে সক্ষম না হয় তাহলে কি কি সমস্যা হবে। তা থেকেই ভেবে রাখা উচিত এবং সেই অনুযায়ী পরিকল্পনা করা উচিত।

বেকারত্ব : পরিবারের উপার্জনকারী ব্যাক্তিটির যদি হঠাৎ করে ইনকাম বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে এর ফলে কী ঘটবে তা আগে থেকেই অবগত হওয়া উচিত। আমরা দেখেছি মহামারী করোনার কারণে এ বছর অনেকেই তাদের চাকরি হারিয়ে ফেলেছে, ফলে অনেকে পরিবারকেই আর্থিক দুর্দশায় পড়তে হয়েছে। কিন্তু এসব পরিবারের যদি আয়ের বিকল্প ব্যবস্থা থাকতো তাহলে হয়তো এমন অবস্থায় পড়তে হতো না।

বয়স : বয়সের কারণে উপার্জনকারী ব্যাক্তিটি আর আয় করতে পারবে না, তখন পরিবার কীভাবে চলবে তা আগে থেকেই পরিকল্পনা করা উচিত।


ব্যয় ঝুঁকি

উচ্চ ব্যয় : কিছু কিছু সময় আমাদের বড় অংকের টাকা ব্যয় করতে হয়, যেমন বাড়ি কেনা, জমি কেনা। এর ফলে অনেকেরই হাত খালি হয়ে যায়, এরুপ পরিস্থিতিতে কী করা উচিত তা আগে থেকেই ভেবে রাখা প্রয়োজন।

জরুরি ব্যয় : পরিবারের কোন সদস্য যদি অসুস্থ হয়ে পড়ে। তাহলে অনেক সময় আমাদের বড় অংকের টাকার প্রয়োজন হতে পারে। তখন যদি হঠাৎ করেই এতো টাকা না পাওয়া যায় তাহলে বড়ো কোন বিপদ হতে পারে। এধরনের অবস্থার জন্য আগে থেকেই আমাদের এমন ব্যবস্থা করা উচিত যেন জরুরি মুহূর্তে টাকা পাওয়া যায়।

বিনিয়োগ ঝুঁকি

এতোসব ঝুঁকির মধ্যে অন্যতম ঝুঁকি হচ্ছে বিনিয়োগ ঝুঁকি। কিভাবে কোথায় বিনিয়োগ করলে লাভ হবে তা না জেনে আন্দাজে বিনিয়োগ করলে আর্থিক ক্ষতি হতে পারে। তাই কোথায় বিনিয়োগ করার আগে বিনিয়োগের ক্ষেত্রকে ভালোভাবে জানা ও বুঝা উচিত।

ঋণ ঝুঁকি

ঋণ গ্রহণের ক্ষেত্রে আমাদের সাবধান হ‌ওয়া উচিত। জরুরী প্রয়োজন না হলে ঋণ নেওয়া উচিত নয়, পরে পরিশোধ করতে না পারলে বিভিন্ন সমস্যার সম্মুখীন হতে হবে।

আর্থিক ঝুঁকি কমিয়ে আনুন ( Mitigate your financial risks )

ধরে নিলাম আপনি একজন সফল ব্যবসায়ী কিংবা একজন চাকরিজীবী। কিন্তু হঠাৎ করে যদি আপনি চাকরি হারিয়ে ফেলেন কিংবা ব্যবসাতে ক্ষতিগ্রস্ত হোন তাহলে কি হবে? তাই আগে থেকেই এ বিষয়ে সতর্ক থাকলে ভবিষ্যতে যদি আপনি চাকরি হারান কিংবা ব্যবসায় ক্ষতিগ্রস্ত হোন এজন্য বেশি দুর্ভোগ পোহাতে হবে না। একটি কাজের পাশাপাশি অন্য আরেকটি কাজে দক্ষতা অর্জন করা উচিত। তাই আয়ের বিকল্প পথ তৈরি করুন। বর্তমান দুনিয়ায় কাজের কোন অভাব নেই, ফ্রিল্যান্সিং সেক্টরে অনেক ধরনের কাজ আছে, আপনি আপনার পছন্দ মত কোন কাজ শিখতে পারেন অথবা আপনার যেটা ভালো লাগে সেটা করতে পারেন।

আরো পড়ুন : ওয়েব ডিজাইন ও ওয়েব ডেভেলপমেন্ট কিভাবে শিখবেন?

অবসর পরিকল্পনা ( Retirement plan )

একটা সময় পর মানুষের আর কর্মক্ষমতা থাকে না। তাকে কর্ম থেকে অবসর গ্রহণ করতে হয়। অবসরের পর অফুরন্ত সময় পাওয়া যায় ঠিকই কিন্তু তখন আর ইনকাম করা যায় না, তাই ছেলে মেয়েদের আয়ের উপর নির্ভর করে চলতে হয়। কিন্তু আগে থেকেই যদি এ ব্যাপারে পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয় তাহলে অবসর সময়টাতে আর্থিক সমস্যা থেকে মুক্ত থাকা যায়। তাই রিটায়ারমেন্টের আগে থেকেই যদি সঞ্চয় করা হয় তাহলে ভবিষ্যতের জন্য নিশ্চিত থাকা যাবে। তাই অবসর গ্রহণের কমপক্ষে দশ বছর আগে থেকেই কিছু অর্থ জমা করতে শুরু করুন। এজন্য জীবন বীমা বা কোন ব্যাংকে ডিপিএস করে রাখলে অবসর গ্রহণের পর তা কাজে লাগানো যাবে।

পার্সোনাল ফাইনান্স বা ব্যাক্তিগত অর্থায়ন কী? । What is personal finance?



Post a Comment